কীভাবে মানুষের ৬ ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করবেন? (ভগবদ্গীতা অনুসারে সম্পূর্ণ গাইড)
মানুষের জীবনে শান্তি, সফলতা, আত্মবিশ্বাস এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণ সবকিছুর মূল ভিত্তি হলো ইন্দ্রিয় সংযম। আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক মানুষ জানে কী করা উচিত, কিন্তু করতে পারে না। কারণ? মন এবং ইন্দ্রিয় আমাদের টেনে নিয়ে যায় ভোগের দিকে। এই সমস্যার সমাধান ভগবদ্গীতায় খুব সুন্দরভাবে দেওয়া আছে। গীতা শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি একটি লাইফ ম্যানুয়াল যেখানে মন, ইন্দ্রিয়, কামনা, ক্রোধ, অভ্যাস এবং আত্ম-শক্তি নিয়ন্ত্রণের বাস্তব নির্দেশনা রয়েছে।
এই আর্টিকেলে আমরা জানবো মানুষের ৬ ইন্দ্রিয় কী, এগুলো কেন নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, এবং ভগবদ্গীতা অনুসারে কীভাবে ৬ ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করবেন একদম সহজ, বাস্তব এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগযোগ্য উপায়ে।
মানুষের ৬ ইন্দ্রিয় কী কী?
সাধারণভাবে মানুষের পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় হলো :-
- চক্ষু (দৃষ্টি) - দেখা
- কর্ণ (শ্রবণ) - শোনা
- নাসিকা (ঘ্রাণ) - গন্ধ নেওয়া
- জিহ্বা (রসনা) - স্বাদ নেওয়া
- ত্বক (স্পর্শ) - স্পর্শ অনুভব করা
আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হিসেবে ধরা হয় মন (Mind) কারণ মনই ইন্দ্রিয়গুলোকে চালায়, ইন্দ্রিয়ের তথ্য গ্রহণ করে এবং সিদ্ধান্ত তৈরি করে।
ভগবদ্গীতায় ইন্দ্রিয় ও মনকে একসাথে মানুষের পতন বা উন্নতির প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়েছে।
ভগবদ্গীতা কেন ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণকে এত গুরুত্ব দিয়েছে?
ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়ের পিছনে ছুটে বেড়ায়, তার বুদ্ধি স্থির থাকে না, মন অশান্ত হয় এবং ধীরে ধীরে সে নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়।
গীতায় এই ধারাবাহিক পতনের পথ খুব স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে:
ধ্যায় → আসক্তি → কামনা → ক্রোধ → মোহ → স্মৃতিভ্রংশ → বুদ্ধিনাশ → পতন
অর্থাৎ, চোখ, কান, জিহ্বা ইত্যাদি যখন বারবার ভোগের দিকে যায়, তখন মন আসক্ত হয়, তারপর কামনা বাড়ে, কামনা পূরণ না হলে ক্রোধ আসে এভাবেই জীবন এলোমেলো হয়ে যায়।
৬ ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের জন্য গীতার ৬টি শক্তিশালী কৌশল
এখন চলুন জেনে নেই, ভগবদ্গীতার আলোকে কীভাবে ধাপে ধাপে ৬ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
১) চক্ষু (দৃষ্টি) নিয়ন্ত্রণ: যা দেখেন, তাই আপনি হন
আজকের যুগে চোখের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রলোভন আসে অপ্রয়োজনীয় ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল, লোভনীয় বিজ্ঞাপন, তুলনা, হিংসা, কামনা সবই চোখ দিয়ে শুরু।
গীতার শিক্ষা: ইন্দ্রিয়কে দমন নয়, সংযম ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবহার করতে হবে।
বাস্তব টিপস:
- দিনে অন্তত ১ ঘণ্টা স্ক্রিন ফ্রি টাইম রাখুন
- ঘুমানোর আগে ৩০ মিনিট মোবাইল বন্ধ করুন
- “আমি এটা দেখলে আমার মন শান্ত হবে, নাকি অস্থির হবে?” এই প্রশ্ন করুন
ফলাফল: চোখ নিয়ন্ত্রণে এলে মন দ্রুত স্থির হতে শুরু করে।
২) কর্ণ (শ্রবণ) নিয়ন্ত্রণ: ভুল কথা শুনলে মন দুর্বল হয়
মানুষ যা শোনে, সেটাই মনে ঢুকে যায়। গসিপ, নেতিবাচক কথা, নিন্দা, অশ্লীল কনটেন্ট এসব মনকে ভেতর থেকে দুর্বল করে।
ভগবদ্গীতা অনুযায়ী, জ্ঞান ও সত্য কথা শুনলে বুদ্ধি পরিষ্কার হয়, আর অযথা কথায় মন অস্থির হয়।
বাস্তব টিপস:
- দিনে ১৫ মিনিট গীতা পাঠ বা ভক্তিমূলক কথা শুনুন
- নেগেটিভ মানুষদের সাথে কথাবার্তা কমান
- “শুনছি” কিন্তু “মনে নিচ্ছি না” এই অভ্যাস তৈরি করুন
৩) নাসিকা (ঘ্রাণ) নিয়ন্ত্রণ: ছোট হলেও প্রভাব বড়
গন্ধ মানুষের মনের সাথে সরাসরি জড়িত। কিছু গন্ধ স্মৃতি জাগায়, কিছু গন্ধ কামনা বাড়ায়, আবার কিছু গন্ধ মন শান্ত করে।
বাস্তব টিপস:
- ঘরে ধূপ/আগরবাতি বা শান্ত সুগন্ধ ব্যবহার করুন
- অতিরিক্ত নেশা বা ক্ষতিকর অভ্যাসের পরিবেশ এড়িয়ে চলুন
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকুন (মনও পরিষ্কার থাকে)
৪) জিহ্বা (স্বাদ) নিয়ন্ত্রণ: জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ মানে জীবন নিয়ন্ত্রণ
ভগবদ্গীতায় জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জিহ্বা শুধু খাওয়া নয়, কথা বলাও নিয়ন্ত্রণ করে।
অতিরিক্ত খাওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাওয়া, বাজে কথা বলা সবই মনকে দুর্বল করে।
গীতায় বলা হয়েছে, সংযমী আহার এবং সাত্ত্বিক জীবনযাপন মনকে স্থির করে।
বাস্তব টিপস:
- অতিরিক্ত ঝাল/তেল/মিষ্টি কমান
- “পেট ভরার আগে থামুন” এই নিয়ম ধরুন
- রাগের সময় কথা না বলে ১০ সেকেন্ড চুপ থাকুন
- সত্য, মধুর এবং প্রয়োজনীয় কথা বলার অভ্যাস করুন
৫) ত্বক (স্পর্শ) নিয়ন্ত্রণ: ভোগ নয়, ভারসাম্য দরকার
স্পর্শের মাধ্যমে সুখ আসে, কিন্তু অতিরিক্ত ভোগ মানুষকে আসক্ত করে। বিলাসিতা, অলসতা, অতিরিক্ত আরাম এসব ধীরে ধীরে কর্মশক্তি কমায়।
ভগবদ্গীতা শেখায়, জীবন হলো সাধনা ও কর্তব্যের পথ অতিরিক্ত ভোগ মনকে দুর্বল করে।
বাস্তব টিপস:
- প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চা করুন
- অতিরিক্ত আরাম (বিছানায় পড়ে থাকা) কমান
- শীত-গরম একটু সহ্য করার অভ্যাস করুন (সহনশীলতা বাড়ে)
৬) মন নিয়ন্ত্রণ: ইন্দ্রিয়ের রাজা মন
ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো মন নিয়ন্ত্রণ। কারণ মনই বলে “এটা দেখো, ওটা খাও, এটা করো।”
ভগবদ্গীতায় মনকে কখনো বন্ধু, কখনো শত্রু বলা হয়েছে।
মন নিয়ন্ত্রণের গীতার ৩টি উপায়:
(ক) অভ্যাস (Practice):
মনকে বারবার সঠিক পথে ফেরাতে হবে।
(খ) বৈরাগ্য (Detachment):
সবকিছু ভোগ করার মানসিকতা কমাতে হবে।
(গ) ভক্তি ও ধ্যান:
ঈশ্বরের স্মরণ, নাম জপ, ধ্যান মনকে স্থির করে।
বাস্তব টিপস:
- প্রতিদিন ১০ মিনিট ধ্যান/শ্বাস-প্রশ্বাস অনুশীলন
- সকালে ৫ মিনিট “আমি আজ শান্ত থাকবো” সংকল্প
- রাতে ৩ মিনিট নিজের দিনটা রিভিউ করুন, কোথায় ইন্দ্রিয় হার মানলো?
ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করলে কী লাভ হবে?
৬ ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ মানে আপনি নিজের জীবনকে নিজের হাতে নেওয়া। এর ফল-
- মন শান্ত থাকবে
- রাগ ও দুশ্চিন্তা কমবে
- পড়াশোনা/কাজে ফোকাস বাড়বে
- খারাপ অভ্যাস কমবে
- আত্মবিশ্বাস বাড়বে
- জীবনের লক্ষ্য পরিষ্কার হবে
- সম্পর্ক ভালো হবে
- আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে
উপসংহার: ইন্দ্রিয় দমন নয়, ইন্দ্রিয় শাসনই আসল শক্তি
অনেকেই ভাবে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ মানে আনন্দ ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু ভগবদ্গীতা বলে, ইন্দ্রিয় দমন নয় ইন্দ্রিয়কে সঠিক পথে পরিচালনা করাই আসল জ্ঞান।
যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে, সে শুধু “ভালো মানুষ” নয় সে একজন শক্তিশালী মানুষ।
আপনি যদি আজ থেকে শুধু ৭ দিন চেষ্টা করেন চোখ, কান, জিহ্বা এবং মনকে একটু সংযমে রাখবেন তাহলে নিজেই পরিবর্তন টের পাবেন।
0 Comments